ফিলিস্তিনে গণহত্যা, বিক্ষোভে উত্তাল সারাবিশ্ব
মুক্তি কোন পথে?
ফিলিস্তিনে গণহত্যা, বিক্ষোভে উত্তাল সারাবিশ্ব
মুক্তি কোন পথে?
আন্দোলন প্রতিবেদন
শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪ | অনলাইন সংস্করণ
সারা পৃথিবীর সৎ, বিবেকবান, প্রগতিশীল, যুদ্ধবিরোধী, মানবতাবাদীদের দাবিকে উপেক্ষা করে নেতানিয়াহু সরকার এ শতাব্দীর সবচেয়ে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ফিলিস্তিনকে নরক বানিয়ে তুলেছে। হত্যাকাণ্ডের শিকার ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা ৩৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আহত হয়েছেন প্রায় ৮০ হাজারের উপর। জানা যাচ্ছে ধ্বংসস্তুপের নিচে আটকে থাকা মৃতের সংখ্যা আরও ১০ হাজার। মৃত লাশের গন্ধে গাজার আকাশ ভারী হয়ে উঠেছে। এসব হত্যাযজ্ঞের মধ্যে আছে দুই-তৃতীয়াংশ নারী-শিশু, আছে ডাক্তার-নার্স, সংবাদকর্মী, দেশি-বিদেশি মানবাধিকার-ত্রাণকর্মীসহ সাধারণ জনগণ। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ বিশেষত ইসরায়েল মার্কিনের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়ে রক্তের এ হলি খেলায় মেতেছে। বৃদ্ধ-শিশু-তরুণ-যুব-নারীদের লম্বা লাশের সারি; গণতন্ত্র, মানবতার বুলি আওড়ানো ‘আধুনিক পুঁজিবাদী’ ব্যবস্থার নগ্ন বিভৎসতার স্বরূপকে আরও একবার উন্মোচন করে দিয়েছে। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে গণকবরের সন্ধান। যুদ্ধের কোনো নিয়মনীতিকেই এ জায়নবাদীরা তোয়াক্কা করছে না। ফিলিস্তিনীরা ইসরায়েলিদের কাছে পশুতুল্য। চলছে গণগ্রেফতার। আহতদের আর্তনাদে গাজার আকাশ ভারী হয়ে উঠেছে। ত্রাণবাহী গাড়ী বহরে হামলা-বাধাদানে ফিলিস্তিনে বিরাজ করছে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি। স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা পুরোপুরিই ভেঙে পড়েছে। তাপদাহের মধ্যে সেখানে পানির সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। খাবার পানির জন্য তীব্র হাহাকার তৈরি হয়েছে। নানা ধরনের সংক্রমিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎহীন গাজা রাত নামলে শ্মশান পুরিতে পরিণত হয়। খোলা আকাশ কারাগার সদৃশ গাজায় অবস্থিত অসহায় ফিলিস্তিনীদের ‘নব্য হিটলার’ নেতানিয়াহু বাহিনীর কাছে গুলির খোরাক হওয়া ছাড়া এ মুহূর্তে গত্যন্তর নেই।
‘মানবতার’ ফেরিওয়ালা পশ্চিমারা তারপরও নীরব। ইনিয়ে বিনিয়ে তারা একপ্রকার ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের সাফাই গাইছে। ‘ঠুঁঠো জগন্নাথ’ জাতিসংঘ নানা নিন্দা-মন্দ জানানো সত্ত্বেও যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে তারা অক্ষম। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে জাতিসংঘ স্রেফ সময়ক্ষেপনকারী ক্লাব, কথার ফুলঝুরি ছোটানোর সংস্থা। নির্লজ্জভাবে পশ্চিমাদের উদ্দেশ্য সাধন করার এক আইনি সংস্থায় পরিণত হয়েছে জাতিসংঘ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান কিছুটা নিজের প্রয়োজনে সোরগোল তুললেও শক্ত কোনো পদক্ষেপের দিকে তারাসহ মধ্যপ্রাচ্যের কেউই এগোয় নি। কূটনৈতিকভাবে যুদ্ধের সমাধানের কথা বলে এসব রাষ্ট্র শুধু ফিলিস্তিনীদের মৃত্যুর সংখ্যাই বাড়িয়ে চলেছে। তুরস্ক-কলম্বিয়া ইতিমধ্যে ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। সাউথ আফ্রিকা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আই সি সি) মামলা, আইসিসি থেকে যুদ্ধবন্ধের নির্দেশ দিলেও তাতে রক্তপিপাসু নেতানিয়াহুর কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। জাতিগতভাবে সমূলে নিমর্ূল অথবা দেশ থেকে বিতাড়িত করার ঘৃণ্য অভিপ্রায়ে বদ্ধপরিকর ইসরায়েল সরকার গাজা থেকে রাফায় আশ্রয় নেয়া সহায় সম্বলহীন লক্ষ লক্ষ (১২ লক্ষ, সবমিলিয়ে রাফার বাসিন্দাসহ ১৬ লক্ষ) ফিলিস্তিনীদের উপর আবারও পাশবিক হামলা শুরু করেছে। হামাস নিমূর্লের নামে সেখানে চলছে নারকীয় হত্যাকাণ্ড।
খুনি নেতানিয়াহু বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে ফুঁসছে পৃথিবীর তাবত সাধারণ মানুষ। খোদ ইসরায়েলের ভেতরেও যুদ্ধ বিরোধী বড় বড় সভা-সমাবেশ প্রতিনিয়তই দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ বিরোধী ছাত্র-বিক্ষোভ স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে আমেরিকার নামীদামী সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসে তঁাবু টানিয়ে এসব ছেলেমেয়েরা অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে ইসরায়েলের সকল সম্পর্ক ছিন্ন করা সহ বিভিন্ন দাবিতে দিনের পর দিন বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। এ আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও যুক্ত হন, সংহতি জানান। ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী বিক্ষোভের পর এত বড় ছাত্র-বিক্ষোভ মার্কিন সমাজ আর দেখে নি। এসকল প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছেলেমেয়েদের বড় অংশই আমেরিকার উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তান হলেও ‘গণতন্ত্রের’ ফেরিওয়ালা মার্কিন পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর ভয়ংকর নির্যাতন-গ্রেফতার জারি রেখেছে। গ্রেফতার-শারীরিক হেনস্থা থেকে বাদ পড়ছেন না শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। ফিলিস্তিনে যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে এ ছাত্র আন্দোলন ইউরোপের গ্রেট ব্রিটেন, জামার্ন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যাণ্ড, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশের খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েছে। লোক দেখানো হলেও ইউরোপের ১৫ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। সম্প্রতি স্পেন ইসরায়েলের উদ্দেশে মার্কিনের অস্ত্র বহনকারী একটি জাহাজ তার নিজ দেশে নোঙর করতে দেয়নি। ইতিমধ্যেই নরওয়ে, স্পেন, আয়ারল্যাণ্ড ফিলিস্তিনকে ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশে বিদেশে ইসরায়েলের গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার পালা কুত্তা ইসরায়েলের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করে চলেছে। ফিলিস্তিনের গণহত্যা সংঘটিত করার পেছনে অব্যহতভাবে সে তার অস্ত্রের যোগান যুগিয়ে যাচ্ছে।
মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে এ পাশবিক হত্যাকাণ্ডে পরোক্ষ অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে মার্কিন ব্লক পরিবর্তনকাঙ্খী আরব দেশগুলোর মধ্যে ভীতি সঞ্চার করতে চায়। হাজারে হাজারে নারী-শিশু নিহত-আহত হলেও যুক্তরাষ্ট্র একে গণহত্যা বলতে নারাজ। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের বৈঠকে খুনি নেতানিয়াহুকে বাইডেন প্রশাসন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে বক্তব্য দিতে। এমনকি আন্তর্জাতিক আদালতে নেতানিয়াহুদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ায় সেই আইসিসিকেই যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জানাতে উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার প্রভুদের কাছে গণতন্ত্র-মানবতা স্রেফ লেবাস। তাদের শ্রেণিস্বার্থের জন্য তারা যে কতখানি নগ্ন-বর্বর হতে পারে, অন্ধভাবে মার্কিন শাসকশ্রেণির নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন তারই নমুনা।
ফিলিস্তিন আজ আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইসরায়েলকে দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর ভয়ংকরতম উন্মত্ততা প্রদর্শন করছে। অন্যদিকে পশ্চিমা সাম্র্যাজ্যবাদ বিরোধী সাম্র্যাজ্যবাদী চীন-রাশিয়ারও যুদ্ধ বন্ধের প্রশ্নে কোনো হেল দোল নেই। যুদ্ধ পরবর্তী ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে তাদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্য হিসেবে চীন হামাস-ফাতাহ’র সাথে বৈঠক করছে। ফিলিস্তিনকে তারা ইস্যু হিসেবে নিয়ে আগামীতে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের খবরদারি আরও জোরদার করতে চাইছে।
পৃথিবীর অনেকে দেশের মতো ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারও ফিলিস্তিনে মার্কিনের গণহত্যা নিয়ে নিন্দা-মন্দ জানিয়েছে। তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন ‘ছাত্রলীগ’ গণহত্যার বিরুদ্ধে বড় শোডাউনের ভড়ং করেছে। এসবই তারা করছে মার্কিনের উপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশে, এবং মার্কিন বিরোধী চীনা পক্ষকে খুশী করার জন্য। আর দেশের জনগণের সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করে বর্তমানে মার্কিনের সাথে সখ্যতা রক্ষাকারী বিএনপি-কে বিচ্ছিন্ন করার জন্য। ফিলিস্তিনী জাতি-জনগণের প্রকৃত জাতীয় মু্িক্তর প্রতি কোনো দরদ থেকে নয়। কয়েক হাজার মাইল দুরের ফিলিস্তিনীদের জন্য হাসিনা মায়া কান্না কাঁদলেও ‘বন্ধু দেশ’ ভারতের মুসলমানদের অসহায়ত্ব হাসিনাকে কোনোভাবেই তাড়িত করে না। মোদি-অমিত-যোগি-হেমন্তরা হিন্দুত্ববাদ চাঙা করতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর হত্যা-সন্ত্রাস-ধর্ষণ-বুলডোজার দিয়ে বাড়ি ঘর গুঁড়িয়ে দেয়া, মুসলিমদের ভারতের মাটি থেকে নির্মূলের কর্মসূচি দিলেও হাসিনা ও তার স্যাঙাতরা তখন কানে-মুখে কুলুপ এঁটে রাখে। ‘মানবতার জননী’ হাসিনার এই হলো সত্যিকার মানবতার নমুনা। ফিলিস্তিনীদের জন্য হাসিনার এই কুম্ভীরাশ্রু জনগণকে ধোঁকা দেয়ার এক কৌশল।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা আজ হন্যে হয়ে উঠেছে তার সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-প্রভুত্ব ধরে রাখার জন্য। প্রতিদ্বন্দ্বী চীনা সাম্রাজ্যবাদকে ও ইউরোপে পুনরায় মাথা তোলা রুশ সাম্রাজ্যবাদকে ঠেকাতে সে আজ মরিয়া। সাম্রাজ্যবাদী মোড়লগিরি টেকাতে মার্কিনের সামনে যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীজুড়ে সাম্রাজ্যবাদীদের যে বিশ্বযুদ্ধের পাঁয়তারা চলছে ফিলিস্তিন তার অংশ মাত্র।
পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থাই ফিলিস্তিন সংকট তৈরি করেছে। তাই ফিলিস্তিনী জনগণের মুক্তি সাম্রাজ্যবাদী কোনো ফর্মুলার মধ্যে নেই। ফিলিস্তিন নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বিরাষ্ট্রের সমাধান, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সমস্যাকে জিইয়ে রাখার এক কূটকৌশল। ফিলিস্তিনী জনগণের সত্যিকার স্বাধীনতা-মুক্তির জন্য পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জারি করতে হবে। সকল ধরনের সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব বলয় থেকে নিজেদের মুক্তিই, তাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে। কোনো ধর্মবাদী আদর্শ তাদের মুক্তি দিতে পারে না। অখণ্ড স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে সাধারণ ইহুদি-মুসলিম-খ্রিষ্টানসহ সকল জনগণকে নিয়ে একটি সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের লক্ষ্যে সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ফিলিস্তিনে গণহত্যা, বিক্ষোভে উত্তাল সারাবিশ্ব
মুক্তি কোন পথে?
সারা পৃথিবীর সৎ, বিবেকবান, প্রগতিশীল, যুদ্ধবিরোধী, মানবতাবাদীদের দাবিকে উপেক্ষা করে নেতানিয়াহু সরকার এ শতাব্দীর সবচেয়ে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ফিলিস্তিনকে নরক বানিয়ে তুলেছে। হত্যাকাণ্ডের শিকার ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা ৩৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আহত হয়েছেন প্রায় ৮০ হাজারের উপর। জানা যাচ্ছে ধ্বংসস্তুপের নিচে আটকে থাকা মৃতের সংখ্যা আরও ১০ হাজার। মৃত লাশের গন্ধে গাজার আকাশ ভারী হয়ে উঠেছে। এসব হত্যাযজ্ঞের মধ্যে আছে দুই-তৃতীয়াংশ নারী-শিশু, আছে ডাক্তার-নার্স, সংবাদকর্মী, দেশি-বিদেশি মানবাধিকার-ত্রাণকর্মীসহ সাধারণ জনগণ। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ বিশেষত ইসরায়েল মার্কিনের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়ে রক্তের এ হলি খেলায় মেতেছে। বৃদ্ধ-শিশু-তরুণ-যুব-নারীদের লম্বা লাশের সারি; গণতন্ত্র, মানবতার বুলি আওড়ানো ‘আধুনিক পুঁজিবাদী’ ব্যবস্থার নগ্ন বিভৎসতার স্বরূপকে আরও একবার উন্মোচন করে দিয়েছে। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে গণকবরের সন্ধান। যুদ্ধের কোনো নিয়মনীতিকেই এ জায়নবাদীরা তোয়াক্কা করছে না। ফিলিস্তিনীরা ইসরায়েলিদের কাছে পশুতুল্য। চলছে গণগ্রেফতার। আহতদের আর্তনাদে গাজার আকাশ ভারী হয়ে উঠেছে। ত্রাণবাহী গাড়ী বহরে হামলা-বাধাদানে ফিলিস্তিনে বিরাজ করছে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি। স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা পুরোপুরিই ভেঙে পড়েছে। তাপদাহের মধ্যে সেখানে পানির সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। খাবার পানির জন্য তীব্র হাহাকার তৈরি হয়েছে। নানা ধরনের সংক্রমিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎহীন গাজা রাত নামলে শ্মশান পুরিতে পরিণত হয়। খোলা আকাশ কারাগার সদৃশ গাজায় অবস্থিত অসহায় ফিলিস্তিনীদের ‘নব্য হিটলার’ নেতানিয়াহু বাহিনীর কাছে গুলির খোরাক হওয়া ছাড়া এ মুহূর্তে গত্যন্তর নেই।
‘মানবতার’ ফেরিওয়ালা পশ্চিমারা তারপরও নীরব। ইনিয়ে বিনিয়ে তারা একপ্রকার ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের সাফাই গাইছে। ‘ঠুঁঠো জগন্নাথ’ জাতিসংঘ নানা নিন্দা-মন্দ জানানো সত্ত্বেও যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে তারা অক্ষম। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে জাতিসংঘ স্রেফ সময়ক্ষেপনকারী ক্লাব, কথার ফুলঝুরি ছোটানোর সংস্থা। নির্লজ্জভাবে পশ্চিমাদের উদ্দেশ্য সাধন করার এক আইনি সংস্থায় পরিণত হয়েছে জাতিসংঘ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান কিছুটা নিজের প্রয়োজনে সোরগোল তুললেও শক্ত কোনো পদক্ষেপের দিকে তারাসহ মধ্যপ্রাচ্যের কেউই এগোয় নি। কূটনৈতিকভাবে যুদ্ধের সমাধানের কথা বলে এসব রাষ্ট্র শুধু ফিলিস্তিনীদের মৃত্যুর সংখ্যাই বাড়িয়ে চলেছে। তুরস্ক-কলম্বিয়া ইতিমধ্যে ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। সাউথ আফ্রিকা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আই সি সি) মামলা, আইসিসি থেকে যুদ্ধবন্ধের নির্দেশ দিলেও তাতে রক্তপিপাসু নেতানিয়াহুর কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। জাতিগতভাবে সমূলে নিমর্ূল অথবা দেশ থেকে বিতাড়িত করার ঘৃণ্য অভিপ্রায়ে বদ্ধপরিকর ইসরায়েল সরকার গাজা থেকে রাফায় আশ্রয় নেয়া সহায় সম্বলহীন লক্ষ লক্ষ (১২ লক্ষ, সবমিলিয়ে রাফার বাসিন্দাসহ ১৬ লক্ষ) ফিলিস্তিনীদের উপর আবারও পাশবিক হামলা শুরু করেছে। হামাস নিমূর্লের নামে সেখানে চলছে নারকীয় হত্যাকাণ্ড।
খুনি নেতানিয়াহু বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে ফুঁসছে পৃথিবীর তাবত সাধারণ মানুষ। খোদ ইসরায়েলের ভেতরেও যুদ্ধ বিরোধী বড় বড় সভা-সমাবেশ প্রতিনিয়তই দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ বিরোধী ছাত্র-বিক্ষোভ স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে আমেরিকার নামীদামী সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসে তঁাবু টানিয়ে এসব ছেলেমেয়েরা অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে ইসরায়েলের সকল সম্পর্ক ছিন্ন করা সহ বিভিন্ন দাবিতে দিনের পর দিন বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। এ আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও যুক্ত হন, সংহতি জানান। ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী বিক্ষোভের পর এত বড় ছাত্র-বিক্ষোভ মার্কিন সমাজ আর দেখে নি। এসকল প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছেলেমেয়েদের বড় অংশই আমেরিকার উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তান হলেও ‘গণতন্ত্রের’ ফেরিওয়ালা মার্কিন পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর ভয়ংকর নির্যাতন-গ্রেফতার জারি রেখেছে। গ্রেফতার-শারীরিক হেনস্থা থেকে বাদ পড়ছেন না শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। ফিলিস্তিনে যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে এ ছাত্র আন্দোলন ইউরোপের গ্রেট ব্রিটেন, জামার্ন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যাণ্ড, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশের খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েছে। লোক দেখানো হলেও ইউরোপের ১৫ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। সম্প্রতি স্পেন ইসরায়েলের উদ্দেশে মার্কিনের অস্ত্র বহনকারী একটি জাহাজ তার নিজ দেশে নোঙর করতে দেয়নি। ইতিমধ্যেই নরওয়ে, স্পেন, আয়ারল্যাণ্ড ফিলিস্তিনকে ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশে বিদেশে ইসরায়েলের গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার পালা কুত্তা ইসরায়েলের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করে চলেছে। ফিলিস্তিনের গণহত্যা সংঘটিত করার পেছনে অব্যহতভাবে সে তার অস্ত্রের যোগান যুগিয়ে যাচ্ছে।
মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে এ পাশবিক হত্যাকাণ্ডে পরোক্ষ অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে মার্কিন ব্লক পরিবর্তনকাঙ্খী আরব দেশগুলোর মধ্যে ভীতি সঞ্চার করতে চায়। হাজারে হাজারে নারী-শিশু নিহত-আহত হলেও যুক্তরাষ্ট্র একে গণহত্যা বলতে নারাজ। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের বৈঠকে খুনি নেতানিয়াহুকে বাইডেন প্রশাসন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে বক্তব্য দিতে। এমনকি আন্তর্জাতিক আদালতে নেতানিয়াহুদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ায় সেই আইসিসিকেই যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জানাতে উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার প্রভুদের কাছে গণতন্ত্র-মানবতা স্রেফ লেবাস। তাদের শ্রেণিস্বার্থের জন্য তারা যে কতখানি নগ্ন-বর্বর হতে পারে, অন্ধভাবে মার্কিন শাসকশ্রেণির নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন তারই নমুনা।
ফিলিস্তিন আজ আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইসরায়েলকে দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর ভয়ংকরতম উন্মত্ততা প্রদর্শন করছে। অন্যদিকে পশ্চিমা সাম্র্যাজ্যবাদ বিরোধী সাম্র্যাজ্যবাদী চীন-রাশিয়ারও যুদ্ধ বন্ধের প্রশ্নে কোনো হেল দোল নেই। যুদ্ধ পরবর্তী ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে তাদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্য হিসেবে চীন হামাস-ফাতাহ’র সাথে বৈঠক করছে। ফিলিস্তিনকে তারা ইস্যু হিসেবে নিয়ে আগামীতে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের খবরদারি আরও জোরদার করতে চাইছে।
পৃথিবীর অনেকে দেশের মতো ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারও ফিলিস্তিনে মার্কিনের গণহত্যা নিয়ে নিন্দা-মন্দ জানিয়েছে। তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন ‘ছাত্রলীগ’ গণহত্যার বিরুদ্ধে বড় শোডাউনের ভড়ং করেছে। এসবই তারা করছে মার্কিনের উপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশে, এবং মার্কিন বিরোধী চীনা পক্ষকে খুশী করার জন্য। আর দেশের জনগণের সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করে বর্তমানে মার্কিনের সাথে সখ্যতা রক্ষাকারী বিএনপি-কে বিচ্ছিন্ন করার জন্য। ফিলিস্তিনী জাতি-জনগণের প্রকৃত জাতীয় মু্িক্তর প্রতি কোনো দরদ থেকে নয়। কয়েক হাজার মাইল দুরের ফিলিস্তিনীদের জন্য হাসিনা মায়া কান্না কাঁদলেও ‘বন্ধু দেশ’ ভারতের মুসলমানদের অসহায়ত্ব হাসিনাকে কোনোভাবেই তাড়িত করে না। মোদি-অমিত-যোগি-হেমন্তরা হিন্দুত্ববাদ চাঙা করতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর হত্যা-সন্ত্রাস-ধর্ষণ-বুলডোজার দিয়ে বাড়ি ঘর গুঁড়িয়ে দেয়া, মুসলিমদের ভারতের মাটি থেকে নির্মূলের কর্মসূচি দিলেও হাসিনা ও তার স্যাঙাতরা তখন কানে-মুখে কুলুপ এঁটে রাখে। ‘মানবতার জননী’ হাসিনার এই হলো সত্যিকার মানবতার নমুনা। ফিলিস্তিনীদের জন্য হাসিনার এই কুম্ভীরাশ্রু জনগণকে ধোঁকা দেয়ার এক কৌশল।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা আজ হন্যে হয়ে উঠেছে তার সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-প্রভুত্ব ধরে রাখার জন্য। প্রতিদ্বন্দ্বী চীনা সাম্রাজ্যবাদকে ও ইউরোপে পুনরায় মাথা তোলা রুশ সাম্রাজ্যবাদকে ঠেকাতে সে আজ মরিয়া। সাম্রাজ্যবাদী মোড়লগিরি টেকাতে মার্কিনের সামনে যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীজুড়ে সাম্রাজ্যবাদীদের যে বিশ্বযুদ্ধের পাঁয়তারা চলছে ফিলিস্তিন তার অংশ মাত্র।
পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থাই ফিলিস্তিন সংকট তৈরি করেছে। তাই ফিলিস্তিনী জনগণের মুক্তি সাম্রাজ্যবাদী কোনো ফর্মুলার মধ্যে নেই। ফিলিস্তিন নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বিরাষ্ট্রের সমাধান, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সমস্যাকে জিইয়ে রাখার এক কূটকৌশল। ফিলিস্তিনী জনগণের সত্যিকার স্বাধীনতা-মুক্তির জন্য পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জারি করতে হবে। সকল ধরনের সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব বলয় থেকে নিজেদের মুক্তিই, তাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে। কোনো ধর্মবাদী আদর্শ তাদের মুক্তি দিতে পারে না। অখণ্ড স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে সাধারণ ইহুদি-মুসলিম-খ্রিষ্টানসহ সকল জনগণকে নিয়ে একটি সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের লক্ষ্যে সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র